জাতির জনক ও ১৫ আগস্ট – Editortoday
BIGtheme.net http://bigtheme.net/ecommerce/opencart OpenCart Templates
Sunday , April 30 2017
Breaking News
Home / অন্যান্য / জাতির জনক ও ১৫ আগস্ট

জাতির জনক ও ১৫ আগস্ট

রাজিউর রহমান রাজু ঃ


১. ১৯৭৫ এর ১২ আগস্ট। ঢাকা গলফ্ ক্লাবে মেজর ফারুক ও তার তরুনী সুন্দরী স্ত্রী ফরিদার তৃতীয় বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে এক জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে ফারুক রশিদকে ডেকে বলে, “আমি শুক্রবারই মুজিবকে শেষ করে দিতে চাই।”
.
ফারুকের বন্ধু এবং ভায়রাভাই মেজর রশিদ। তারা দুজনই অপরিসীম মেধাবি এবং সেনাবাহিনীতে জনপ্রিয় মেজর। তবে তারা ছিলেন বিপথগামী। বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল পরিকল্পনাকারি এরা দুজনই।
.
২. ১৯৭৩ সাল। আরব-ইসরাইল যুদ্ধ চলছে। আরবদের পক্ষ সমর্থনের নিদর্শন স্বরূপ মুজিব সরকার মিশরে বিমান ভর্তী উৎকৃষ্টমানের চা পাঠিয়ে দিলেন। মিশর এ উপহার অত্যান্ত আনন্দের সাথে গ্রহণ করল।
.
যুদ্ধ শেষ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বাংলাদেশের উপহারের কথা ভুলেননি। তিনি জানতেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তেমন অস্ত্র শস্ত্র নেই, তাই ত্রিশটি টি-৫৪ ট্যাংক বহর বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে দিতে চাইলেন।
.
এই প্রস্তাব মুজিবের মনে ভিতির সঞ্চার করে। দীর্ঘ রাজনীতিক জীবনে সেনাবাহিনীর সব কিছুতে তার গভীর ঘৃণা জন্মেছিল। কারন দুই সেনা শাষক, আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া তার জীবন অতিষ্ট করে তুলেছিল। আইয়ুব শাষনের দশ বছর তাকে প্রায় জেলে থাকতে হয়েছে। যুদ্ধের নয় মাস ইয়াহিয়া তাকে পাকিস্তান জেলে বন্দী করে রাখে যার পাসে তার কবরও খোড়া হয়েছিল।
.
বঙ্গবন্ধু একবার বলেছিলেন,”…পাকিস্তান মিলিটারীর মত আমরা একটা দানব সৃষ্টি করতে চাইনা।” তাই স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর ক্ষমতা সিমিত করে তিনি জাতিয় রক্ষীবাহিনী গঠন করেন।
.
১৯৭৪ সালের বসন্তকালে মিশরের ত্রিশটি টি-৫৪ ট্যাংক ও ৪০০ রাউণ্ড ট্যাংক এর গোলা বাংলাদেশে এসে পৌছে। তখন বাংলাদেশের একমাত্র সাজোয়া রেজিমেন্ট “ফার্স্ট বেঙ্গল ল্যান্সার্স”-যার উপ-অধিনায় ছিলেন মেজর ফারুক। অস্ত্র শস্ত্রের ব্যাপারে তার চেয়ে অভিজ্ঞ রেজিমেন্টে কেউ ছিলনা। সুতরাং ট্যাংকগুলো তার নিয়ন্ত্রণাধীনে চলে যায়। এক বছর পর ফারুক ঐ ট্যাংকই মুজিবের বাড়িতে নিয়ে যায় এবং তার বিরুদ্ধে ব্যাবহার করে।
.
মুজিবকে হত্যার পরিকল্পনা ফারুকের অনেক দিনের। এ ব্যাপারে তার একান্ত সঙ্গী ছিল মেজর রশিদ। রশিদ তাদের পরিকল্পনার পক্ষে সমর্থন লাভের জন্য সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করতে থাকেন। জেনারেল জিয়াকে মুজিব হত্যার কথা রশিদ বলকে গেলে; জিয়া বলেন, “আমরা এ সবে জড়াতে চাইনা, তবে তোমরা জুনিয়ররা চাইলে কিছু একটা করতে পায়…”
মুজিব হত্যার পিছনে জিয়ার সম্মতি ছিল।
.
ফারুক আর রশিদের ইচ্ছা ছিল মুজিবকে হত্যার পর আওয়ামী লীগারদের মধ্যে একজনকে ক্ষমতায় বসাতে যেন জনগন সহজেই মুজিব হত্যার ব্যাপারটি মেনে নিতে পারে। রশিদ খন্দকার মোশতাকের বাড়িতে গিয়ে নানান কথার ছলে আসল কথাটা ইশারায় বলে দেন। মোশতাক বুদ্ধিমান মানুষ, তিনি মৌন সম্মতি জ্ঞাপন করেন। কারন তিনি ক্ষমতালোভী ছিলেন। ইতিহাসে মিরজাফরের চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক মোশতাক।
.
৩. চট্রগ্রামে এক অন্ধ দরবেশ ছিল, যার ভবিষ্যৎবানী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মিলে যেত। ফারুক এই অন্ধ্যা হাফেজের সাথে দেখা করে তার পরিকল্পনার কথা বললে দরবেশ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার জন্য তার হাতে একটি কবচ তুলে দেন এবং আরো কিছুদিন সবুর করতে বলেন। ৭৫ এর ১৫ আগস্টের দুইদিন আগে ফারুক তার স্ত্রী ফরিদাকে অন্ধ হাফেজের মতামত শুনতে পাঠান। হাফেজ বলেন, “সময় হয়ে এসেছে….” ফরিদা চট্রগ্রাম থেকে টেলিফোনে ফারুককে এই খবর দেন। ফারুক তার ট্যাংকবহর নিয়ে মুজিবের বাড়ির দিকে অগ্রসর হন।
.
১৫ আগস্ট ঘটে যায় ইতিহাসের নির্মম হত্যাকাণ্ডটি। স্বয়ংক্রীয় অস্ত্র হাতে জোয়ানরা এগিয়ে আসে। বঙ্গবন্ধুর বুকে গুলি করেন মেজর নূর। মোশতাক সেনাবাহিনীর সাথে শর্তমূলক আলাপ আলোচনা করে বেতার কেন্দ্রে গিয়ে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষন দেন এবং নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষনা করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দেশটা এত বেশি বিশ্বাসঘাতকে ভরে গিয়েছিল যে তার হত্যার পর কেউ প্রতিবাদ করেনি। শুধুমাত্র বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকি ভারতে গিয়ে মুজিব হত্যার প্রতিবাদ স্বরূপ সীমান্তের থানাগুলোতে আক্রমন চালায়।
.
বঙ্গবন্ধু এক যাদুস্পর্শী নাম, যার নামের ছোঁয়ায় অনেক অসম্ভব সম্ভব হয়ে যেত। এই মহাপুরুষকে হত্যা করে বাঙালী জাতির ইতিহাসে কলঙ্কের কালো দাগ লাগিয়ে দেয় বিপথগামী কিছু সেনা অফিসার।
.
শেখ মুজিবের দুটি অমর বানী দিয়ে লেখাটা শেষ করছি-
.
“দেশের জন্য আমি যা করেছি তা কেউ বুঝতে পারল না।”
.
“জনগনকে ভালোবাসার মধ্যেই আমার শক্তি নিহিত। আর আমার দুর্বলতা হচ্ছে এই যে, আমি তাদেরকে অতিমাত্রায় ভালোবাসি।”
.
সূত্র:
১. Bangladesh: The Unfinished Revolution -Journalist Lifsulj
২. বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ – এ্যান্থনী মারকারেনহাস
৩. দেয়াল -হুমায়ুন আহমেদ

Leave a Reply