BIGtheme.net http://bigtheme.net/ecommerce/opencart OpenCart Templates
Monday , January 23 2017
Home / অন্যান্য / মধ্যপন্থীদের পাশে রাখলে কিন্তু জোরটা বাড়ে
Loading...

মধ্যপন্থীদের পাশে রাখলে কিন্তু জোরটা বাড়ে

সেমন্তী ঘোষ

বাংলাদেশের বিজয় দিবস প্রতি বছরই আসে যায়। তবু এই বছরটা যেন অন্য রকম। ৪৫তম বিজয় দিবস উদ্‌যাপনের সময় ‘বিজয়’ কথাটিই যেন সে দেশে অন্য মাত্রা পেয়েছে। হয়তো প্রচ্ছন্নে। তবুও। টানা কয়েক বছরের চাপা টেনশন যেন মাটি ফেটে বেরিয়ে আসছে, বিজয় এটাই। একটা তীব্র নাড়া খেয়ে উগ্র ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে ধর্মভীরু (কিন্তু ধর্মান্ধ নয়) মুসলিম বাঙালির ভয় ও অনাস্থা প্রকাশ শুরু হয়েছে, এটাই বিজয়। জুলাই মাসে হোলি আর্টিজান বেকারির ঘটনার পর প্রশাসন সর্বশক্তি দিয়ে দেশকে বড় ধরনের সন্ত্রাস থেকে মুক্ত রাখার প্রচেষ্টা করেছে, সেই প্রচেষ্টা অনেকাংশে সফলও হয়েছে— একটা বড় বিজয়। বিদেশি, হিন্দু, এবং শিয়া মুসলিমরাই যেখানে সন্ত্রাসের লক্ষ্য, তার পরও সেই দেশে বিদেশি সমাগম অব্যাহত রাখা গিয়েছে, বহু বিদেশি অভ্যাগতকে আহ্বান করে এনে ঢাকা লিটরারি মিট কিংবা শাস্ত্রীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত সম্মিলন নিরাপদে পার হওয়া গিয়েছে, সে এক বিজয়ই তো। দেশে একটা সামাজিক মন্থন শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। ঠিক বলছেন কি না জানি না। কিন্তু বছরের শেষে এসে এইটুকু যে মনে করা যাচ্ছে, সেটাই বা কম কী! উল্টোটাও হতে পারত, হয়নি। বিজয় নয়?

এ এক এমন বিজয়, যা নিয়ে বিশেষ আলোড়ন করতে বাংলাদেশ প্রশাসন মোটেই রাজি নয়। সেখানকার নাগরিকরাও নন। তাঁরা বোধহয় ভাবছেন, এত দ্রুত আশার প্রদীপ সর্বসমক্ষে না জ্বালানোই ভাল। ঘরের নিভৃতে শিখাটি জ্বলুক আগে, বাঁচুক ভালয় ভালয়। তার পর বাইরে আনলেই চলবে। না হলে যদি এক ঝটকায় শিখাটি নিবিয়ে দিয়ে যায় কেউ? ভয়ই সকলকে কানে কানে বলে দেয়, সাবধান! বেশি কথা, বেশি উদ্‌যাপন, দরকার কী এ সবের?

পরিবর্তন বা জয়, যা-ই হোক না কেন, সেটা তাই সন্তর্পণ সতর্কতায় মোড়া। এক বছর আগেও ঢাকার রাস্তাঘাটে হিজাব-মোড়া মুখের ছড়াছড়ি ছিল, ২০১৬-র শেষে যেন সেটা অনেকটাই কম, কিন্তু থাক, তা নিয়ে হইচই না হলেই ভাল। মুক্তমনা লেখকদের নিরাপত্তা নিয়ে টেলিভিশন-অনুষ্ঠান এক বছর আগেও ভাবা যেত না, আজ যাচ্ছে, কিন্তু তা নিয়ে কোনও আত্মপ্রসাদ নয়। হোলি আর্টিজান বেকারির কালান্তক ঘটনার পর সে দিনের ঘাতক যুবাদের দেহ আজ অবধি কোনও পরিবার থেকে কেউ ফেরত নিতে আসেননি, যদিও তারা কারা, কোন বাড়ির ছেলে, কোথাকার ছাত্র, সে সব তথ্য সর্বজ্ঞাত। সে দিনের ঘটনার পর অনেক মা-বাবা-ই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নিখোঁজ সন্তানের কথা পুলিশকে জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের কাছে খবর পেয়ে বেশ কয়েকটি উগ্রবাদী ঘাঁটি ভেঙে দিতে পেরেছে বাংলাদেশের পুলিশ। সম্প্রতি প্রশাসনিক উদ্যোগে মসজিদের ইমামদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে, নামাজের সময় ধর্মীয় পাঠের পর ইমামরা যখন নীতিকথা বলেন, তাতে কী কী বলতে হবে বা হবে না তার একটা কাঠামো ঠিক করার চেষ্টা চলছে। অনেকেই জানেন এ সব, কিন্তু প্রশাসনের বাইরে এ নিয়ে কলরব নেই। দেখাই যাক না, কয়েক দিনের সাফল্যের জল ভবিষ্যতেও গড়ায় কি না।

আরও পড়ুন   যে সেতুতে উঠতে হিম হয়ে আসে রক্ত!

এ বছর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিজয়টা সম্ভবত এইখানে। অত্যন্ত ব্যাপক, গভীর একটা যুদ্ধে নেমে খানিকটা সাফল্যের মুখ দেখেও আত্মগর্বিত না হওয়ার মধ্যে। বিপদের পরিমাণটা বুঝে বিপদ মোকাবিলা নিয়ে আদেখলাপনা না করতে। এই সীমাজ্ঞান কুর্নিশ করার মতো। কুর্নিশ কেবল দেশের সরকারকে নয়। দেশের অগণিত নাড়া-খাওয়া মানুষকেও। অনেকে একসঙ্গে লড়াইটা লড়ছেন তাঁরা। মৌলবাদী ইসলামি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সেই গুরুতর লড়াইয়ে কী হবে, তার উপর নির্ভর করছে বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের ভবিষ্যৎ।

একটা প্রশ্ন তবু থেকে যায়। প্রচ্ছন্ন আর সতর্ক লড়াইয়ের সূত্রটা কি সাম্প্রতিক কালের শিক্ষা? কিছু দিন আগে পর্যন্ত যেন পথটা অন্য রকম ছিল, হঠাৎই দিক পরিবর্তন? কেন প্রশ্নটা উঠছে, খুলে বলা যাক। ভারত এ বারের সার্ক বৈঠক বয়কট করার পর বাংলাদেশও যখন নিজেকে সরিয়ে নিল, দেশি বিদেশি প্রচারমাধ্যম বার বার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিয়ে বলানোর চেষ্টা করেছিল, ভারতের প্রতি আনুগত্যই তাঁর এই পদক্ষেপের কারণ। হাজার জোরাজুরিতেও শেখ হাসিনা কিন্তু কথাটা মানেননি। অতিরিক্ত ভারত-সখ্যের অপবাদ কাটাতে চাইছিলেন নিশ্চয়ই। এও দাবি করেছিলেন, ভারতের পাকিস্তান-বিরোধিতা থেকে বাংলাদেশের পাকিস্তান-বিরোধিতা স্বতন্ত্র। বলেছিলেন, ভারত-পাক দ্বিপাক্ষিক সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশের কিছু যায়-আসে না। তাঁর সমস্যা— বাংলাদেশ সার্বভৌম দেশ, তাই তার যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবু্নালের কাজকর্মের সমালোচনা পাকিস্তান করতে পারে না। যে অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করছে তাঁর প্রশাসন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তারা পাকিস্তানের দিকে ছিল বলেই পাকিস্তান আজও তাদের নিয়ে সরব থাকবে? দুটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মধ্যে ১৯৭১’কে এখনও টেনে আনা হবে?

ঠিক বলেছিলেন শেখ হাসিনা। ৪৫ বছর আগের ইতিহাস টেনে এনে আজও কূটনীতির খেলা মানা যায় না। কিন্তু… একটা ‘কিন্তু’ আছে। ১৯৭১-এর ইতিহাস-ফাঁদ থেকে পাকিস্তান বেরিয়ে আসুক, এই দাবি যিনি করেন, দেশের ভেতরে তিনিই আবার সমানে একাত্তরের ছায়া টেনে রাজনীতি করেন? একের পর এক যুদ্ধাপরাধীকে বন্দি করে, ফাঁসি দিয়ে, হাসিনা কি ইতিহাসের খেলাটাই খেলছেন না? আর সেই সূত্রে বিরুদ্ধ পক্ষের জোর বাড়াচ্ছেন না? বাংলাদেশের অস্তিত্বে মুক্তিযুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা বিরাট, কিন্তু একমাত্র তার ‘মীমাংসা’র উপরই সে দেশ সুস্থিত হতে পারে, এই প্রতিশোধের রাজনীতি বিপজ্জনক, কেননা মৌলবাদী ইসলামের ক্রোধও সেই ইতিহাস থেকেই সঞ্চারিত। আওয়ামি লিগ যতই মুক্তিযুদ্ধের হাওয়া নিজের পালে লাগিয়ে বিএনপি ও জামাতকে কোণঠাসা করতে চাইবে, দেশে ততই বিভাজন বাড়বে। মৌলবাদী আতিশয্যের দিকে ততই একাংশকে ঠেলে দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন   ভয়াবহ সংঘর্ষের পর একে অপরকে হুঁশিয়ারি ভারত-পাকিস্তানের

দেশকে বিরোধীশূন্য রাখার রাজনীতিটা অনেক দিন ধরে চলছে। বিরোধীদের গণতন্ত্রের নাগালের বাইরে রেখে দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সন্ত্রাসে আই-এস, আল-কায়দার যোগসাজশ নেই, সব কেবল বিরোধী পার্টির কারসাজি— এই দাবিতে জেদাজেদি চলছে। বিরোধীদের জায়গা ছাড়লে হাসিনার সরকার বা দল আস্ত থাকবে না, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের শেষ ভরসাটুকুও যাবে, এই হল ভয়। কিন্তু এ়কটা জনজাতির ভবিষ্যৎ কি প্রতিশোধ দিয়ে তৈরি করা সম্ভব বা সঙ্গত? শেখ হাসিনা কিন্তু আর একটু সতর্ক হতে পারতেন। মনেপ্রাণে মুসলিম কিন্তু অমৌলবাদী যে সমাজটার খাতিরে আজ কয়েক মাস ধরে দেশ জুড়ে সতর্ক কর্মসূচি দেখতে পাচ্ছি আমরা, আরও অনেক আগেই যুদ্ধাপরাধীদের উপর থেকে অতিরিক্ত ফোকাস সরিয়ে সেই সমাজটাকে কাছে টানার (বা দূরে না ঠেলার) চেষ্টা করতে পারতেন তিনি।

ধর্মভীরু সহিষ্ণু বাংলাদেশকে মৌলবাদের কবল থেকে রক্ষা করতে হলে মডারেট মুসলিমদের কাছে টানার সতর্কতাটা অত্যন্ত জরুরি। বিজয় দিবস আবার তা মনে করাল।

Loading...

Leave a Reply