দখল-দূষণে ‘ধলেশ্বরী’ : আরেকটি নদীর মৃত্যুকথন – Editortoday
BIGtheme.net http://bigtheme.net/ecommerce/opencart OpenCart Templates
Sunday , April 30 2017
Breaking News
Home / অন্যান্য / দখল-দূষণে ‘ধলেশ্বরী’ : আরেকটি নদীর মৃত্যুকথন

দখল-দূষণে ‘ধলেশ্বরী’ : আরেকটি নদীর মৃত্যুকথন

উপ-সম্পাদকীয়ঃ

রকিবুল সুলভ ঃ

 

“রাইসর্ষের খেত সকালে উজ্জ্বল হলো-
দুপুরে বিবর্ণ হ’য়ে গেল
তারি পাশে নদী;
নদী,তুমি কোন কথা কও?”

                               -জীবনানন্দ দাশ

জীবনানন্দের নদী কবিতার দুটি চরণ দিয়ে শুরু করলাম। শুধু জীবনানন্দই নয় পুরো বাংলা সাহিত্য জুড়েই নদী এসেছে সেই শুরুর কাল থেকে। নদী যেমনই গতিশীল তেমনি মানুষের জীবন। তাই নদীর মানুষের জীবনের সাথে এক অদ্ভুত মিল রয়েছে।

একসময় বাংলাদেশ নদীমাতৃক হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রতিদিনই এ দেশের কোন না কোন নদী মরে যাবার খবর শোনা যাচ্ছে। নদীমাতৃক এই দেশে নদী মরে যাবার খবর শুনে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবার কথা তা মোটেও দেখা যায় না। যদিও এ দেশের অর্থনীতি অনেকটাই নদীর উপর নির্ভরশীল এবং নদীর সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত দেশের বেশিরভাগ মানুষের ভাগ্যলিপি।

নদী দূষণ নতুন কোন বিষয় না; বেশ পুরনো। কত নদীই তো মরে গেছে। আমরা নদীগুলোকে খুন করেছি, মেরে ফেলেছি কিংবা খেয়ে ফেলেছি। দূষণ, দখল আর ভরাটে  নদী কি আর বাঁচে?

এদেশে নদী মরলেও কারো কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। একের পর এক নদী দখল, দূষণ আর ভরাটে মরে যাচ্ছে। গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হচ্ছে; আমরা দেখছি, আবার সকালে ঘুম থেকে উঠে ভুলে যাচ্ছি। কিন্তু আমার বাংলাদেশ তো, তাই কোন নিরাময় দেখছিনা।

কিছুদিন ধরেই দেখছি ‘ধলেশ্বরী’ নদীটি নিয়ে বেশ লেখালেখি হচ্ছে। ‘ট্যানারির বর্জ্যে এবার আক্রান্ত ধলেশ্বরী’ কিংবা ‘সিমেন্ট ফ্যাক্টরির বর্জ্যে দূষিত ধলেশ্বরী’- এ রকম শিরোনামগুলো চোখে পড়ছে। তাহলে বলা যেতেই পারে আরেকটি নতুন নদীর মৃত্যু হতে চলেছে।

ধলেশ্বরীর মৃত্যুকথন শোনার আগে একটু পরিচয় জেনে নিই। উইকিপিডিয়া বলছে,

“ধলেশ্বরী নদী হচ্ছে বাংলাদেশের মধ্যভাগে দিয়ে প্রবাহিত একটি জলধারা। এটি যমুনা নদীর একটি শাখা। এর দৈর্ঘ্য ১৬০ কিলোমিটার।
টাঙ্গাইল জেলার উত্তর পশ্চিম প্রান্তে যমুনা নদী হতে ধলেশ্বরীর সূচনা। এটি এর পর দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায় – উত্তরের অংশটি ধলেশ্বরী আর দক্ষিণের অংশটি কালীগঙ্গা নামে প্রবাহিত হয়। এই দুইটি শাখা নদী মানিকগঞ্জ জেলার কাছে মিলিত হয়, এবং সম্মিলিত এই ধারাটি ধলেশ্বরী নামে প্রবাহিত হয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার কাছে শীতলক্ষা নদীর সাথে মিলিত হয়ে পরবর্তীকালে মেঘনা নদীতে পতিত হয়।
ধলেশ্বরী বর্তমানে যমুনার শাখা, কিন্তু প্রাচীন কালে এটি সম্ভবত পদ্মা নদীর মূল ধারা ছিলো। ১৬০০ হতে ২০০০ সালের মধ্যে পদ্মার গতিপথ ব্যাপকভাবে পাল্টে গেছে। ধারণা করা হয়, কোনো সময়ে পদ্মার মূল ধারাটি রামপুর-বোয়ালিয়া এলাকা ও চলন বিল এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে, পরে ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা নদীর মাধ্যমে মেঘনায় গিয়ে পড়তো। ১৮শ শতকে পদ্মার নিম্ন প্রবাহটি ছিলো আরো দক্ষিণে। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মূল প্রবাহ ধলেশ্বরী হতে দক্ষিণের প্রবাহে, তথা কীর্তিনাশা নদীতে সরে যায়, যা বর্তমানে পদ্মার মূল গতিপথ।”
সুত্রঃ উইকিপিডিয়া

এইতো, মাত্র ১০-১২ বছর আগেও ধলেশ্বরী ছিল যৌবনা। ধলেশ্বরীর বুকে নৌকা বেয়ে জাল টেনে শত রকম মাছ পাওয়া যেত। আর এই নদীর পানি তাদের তৃষ্ণা আর দৈনন্দিন কাজে পানির চাহিদা। কিন্তু নগরায়ণ ও শিল্পায়নের করাল গ্রাসে ধলেশ্বরী হারিয়েছে তার রূপ ও যৌবন। একসময় ধলেশ্বরী নদীতে সাতার কাটতেও মানুষ ভয় পেতো। এখন সেই নদী দেখে বোঝার উপায় নেই এটি কি সত্যি নদী কি না। শুকিয়ে যাচ্ছে নদী, ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পরছে নদীপথ। ধলেশ্বরী নদী এখন সরু খালে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের ছোট-বড় লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযানগুলো ঝুঁকি নিয়ে চলছে।

ধলেশ্বরী নদীর তীরে গড়া একাধিক ফ্যাক্টরি নদী দখল করে নেওয়ায় সংলগ্ন এলাকায় বসবাসরত  নারী-পুরুষ ও শিশুরা ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়াসহ শ্বাস-প্রশ্বাস ও চর্ম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া গাছপালা ও ফসলাদির ক্ষতি হচ্ছে। নদীর পানি অনেকটা কালো আলকারতরার মতো রূপ নিয়েছে। নদীর পানি দিয়ে গোসল করলে নানা ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে ধলেশ্বরী তীরবর্তী এলাকার মানুষ।

নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অবাধে গড়ে ওঠা প্রায় ৪০ টি চাতাল কলের মালিকরা প্রতিদিন শত শত টন ছাই ফেলে মুন্সীগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবাহমান ধলেশ্বরী নদীকে দূষিত করছে। পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট করছে নদীর পানি। অন্যদিকে এসব রাইস মিলের বা করখানার ধুলা-ময়লা, ছাই উড়ে গাছপালা, বসতঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ দারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এসব দেখেও পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা যেন নির্বিকার। এছাড়াও ধলেশ্বরীর বিভিন্ন অংশে বালু দিয়ে ভরাট করে বালুসহ অন্যান্য প্রায় ২০ টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায়,

”পরিবেশ অধিদপ্তর গত ২৯ ডিসেম্বর ধলেশ্বরী নদীর পানি ও সিইটিপি থেকে বের হওয়া বর্জ্য পরীক্ষা করে ক্ষতিকর ১১টি উপাদানের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি দেখতে পেয়েছে। এর মধ্যে আছে পানির তাপমাত্রা, ক্ষারের পরিমাণ, দ্রবীভূত অক্সিজেন কম থাকা, বিদ্যুৎ পরিবাহন, ক্রোমিয়ামের পরিমাণ, লবণের পরিমাণ, জৈব রাসায়নিক উপাদান।”                           (সূত্রঃ প্রথম আলো/৯ জানুয়ারি,২০১৭)

দেখা গেছে ধলেশ্বরী নদীর পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিক তাপমাত্রা থেকে বেড়ে গেছে এবং কমে গেছে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ পানিতে বসবাসকারী জীবের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হবে। একই সাথে পানিতে ক্ষারের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পানিতে ক্ষারের মাত্রা বেড়ে গেলে মাছ মরে যায়, এবং মাছের দেহ থেকে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়।পানিতে পাওয়া গেছে ক্রোমিয়ামের অস্বাভাবিক উপস্থিতি।

নদী মরে যাবার কারণে শুধু মানুষই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেনা, একই সাথে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ, হারিয়ে যাচ্ছে মাছ, জলচর পাখি, উভচর, সরীসৃপ আর জলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী। যার পরোক্ষ প্রভাব ঘুরে ফিরে আবার মানুষের উপরই পরতে বাধ্য।

এছাড়াও মাত্রারিক্ত পলি এসে একই সাথে ভাঙ্গন এবং পলি পতনে নদী তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলছে। বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ, বাঁধসহ সেচ প্রকল্প, রাস্তা নির্মাণ, ইত্যাদি অপরিকল্পিত অবকাঠামো নদীর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে নষ্ট করে ফেলছে। ফলশ্রুতিতে মরানদীর খাতায় নাম উঠতে যাচ্ছে আরেকটি নদীর। খুব শীঘ্রই যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তবে মৃতপ্রায় ধলেশ্বরী চিরতরেই মরে যাবে ।

Leave a Reply